অ্যাপলের “বাজেট” খেলা আবার শুরু - "খেলা হবে"
Apple Macbook Neo- অবশেষে এসে গিয়েছে, যেটা আমি ভালোভাবে ব্যবহার করে দেখেছি এবং সত্যি বলতে এখানে অনেক কিছু আলোচনা করার আছে। যখন এই ল্যাপটপটি লঞ্চ হয়, তখন মার্কেটে একেবারেই আলাদা একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কারণ এটা অ্যাপলের প্রোডাক্ট, আর যখনই অ্যাপল “বাজেট্” শব্দটা ব্যবহার করে, তখন বিষয়টা স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
আমরা এর আগে ম্যাক মিনি-র ক্ষেত্রেও একই জিনিস দেখেছি। কম দামে লঞ্চ হয়েছিল এবং সঠিকভাবে বিচার করলে সেটা খুবই ভালো একটি প্রোডাক্ট ছিল। কিন্তু অ্যাপলের বাজেট ক্যাটাগরিতে বিষয়টা কখনোই সরল নয়। আপনি ভালো কিছু পাবেন, কিন্তু তার সঙ্গে কিছু কম্প্রোমাইজও থাকবেই।
Apple Macbook Neo - র ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হচ্ছে। কেউ এটাকে এডিটিং মেশিন বলছে, আবার কেউ বলছে সিরিয়াস কাজের জন্য এটা তেমন ভালো নয়। তাহলে আসল সত্যিটা কী? এই ল্যাপটপ আসলে কার জন্য? আর আপনার কি এটা কেনা উচিত?
চলুন সবকিছু সহজ এবং বাস্তবভাবে বিশ্লেষণ করি।
ডিজাইন এবং বিল্ড কোয়ালিটি: প্রিমিয়াম লুক, কিন্তু পুরোপুরি Macbook Air লেভেলের নয়
ডিজাইন দিয়ে শুরু করলে, ম্যাকবুক নিও দেখতে একেবারে একটি সাধারণ ম্যাকবুকের মতো। প্রথম দেখায় আপনি বুঝতেই পারবেন না যে এটি একটি বাজেট ল্যাপটপ। এতে অ্যাপলের সেই ক্লিন এবং মিনিমাল ডিজাইন রয়েছে, সাথে মেটাল বডি, যা হাতে খুবই প্রিমিয়াম লাগে।
এর ওজন প্রায় ১.২৩ কেজি, যা ম্যাকবুক এয়ারের কাছাকাছি। তবে ওজনের বন্টন একটু আলাদা মনে হতে পারে। তবুও এটি হালকা, বহন করা সহজ এবং কলেজ, অফিস বা ট্রাভেলের জন্য একদম উপযুক্ত।
তাহলে অ্যাপল কোথায় কম্প্রোমাইজ করেছে? বেজেল। আপনি ম্যাকবুক এয়ারের তুলনায় একটু মোটা বেজেল লক্ষ্য করবেন। এটা খুব খারাপ নয়, কিন্তু হালকা একটা “বাজেট অ্যাপল প্রোডাক্ট” ফিল দেয়।
স্পিকার দু’পাশে দেওয়া হয়েছে, এবং সাউন্ড কোয়ালিটি ভালো হলেও ম্যাকবুক এয়ারের থেকে সামান্য কম। তবে এই দামের অনেক উইন্ডোজ ল্যাপটপের তুলনায় এটি ভালো পারফর্ম করে।
এছাড়াও আপনি পাচ্ছেন ১০৮০p ওয়েবক্যাম, যা ভিডিও কলের জন্য যথেষ্ট ভালো। সাধারণ আলোতে কোয়ালিটি ভালো থাকে, এবং ডুয়াল মাইক্রোফোনের অডিওও পরিষ্কার। তবে Center Stage-এর মতো ফিচার এখানে নেই, যা আবার অ্যাপলের কস্ট কাটিং দেখায়।
ট্র্যাকপ্যাড ম্যাকবুক এয়ারের থেকে একটু ছোট, কিন্তু এখনও খুবই স্মুথ এবং রেসপনসিভ। সব জেসচার ঠিকঠাক কাজ করে, এবং মোটেও সস্তা মনে হয় না। অ্যাপল বেসিক জিনিসগুলো ঠিকভাবে করতে জানে।
পোর্টস এবং কানেক্টিভিটি: অ্যাপল তো অ্যাপল-ই
এবার আসি পোর্টস নিয়ে, আর এখানেই একটু বিরক্তি আসতে পারে। আপনি পাচ্ছেন দুটি টাইপ-সি পোর্ট, যার মধ্যে একটি ধীরগতির (৪৮০ Mbps) এবং অন্যটি দ্রুত (১০ Gbps)। কিন্তু এখানে Thunderbolt সাপোর্ট নেই, যা এই দামে সত্যিই হতাশাজনক।
দুটো পোর্টই একই পাশে দেওয়া হয়েছে, আর অন্য পাশে শুধু হেডফোন জ্যাক রয়েছে। ফলে বেশি কানেক্টিভিটির দরকার হলে আপনাকে ডংগল ব্যবহার করতেই হবে।
এটা অ্যাপল ইচ্ছাকৃতভাবেই করেছে। তারা চায় আপনি আরও দামী প্রোডাক্ট যেমন ম্যাকবুক এয়ার বা প্রো-তে আপগ্রেড করুন।
কিবোর্ড এবং টাচ আইডি: সবচেয়ে বড় কস্ট-কাটিং
এখানেই বিষয়টা একটু বেশি প্রশ্ন তৈরি করে।
এই ল্যাপটপে ব্যাকলিট কিবোর্ড নেই। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। প্রায় ₹৬০,০০০–₹৭০,০০০ দামের ল্যাপটপে কিবোর্ড ব্যাকলাইট নেই। এটা এমন একটা জায়গা যেখানে অনেক সস্তা ল্যাপটপও ভালো করে দেয়, তাই এটা অপ্রয়োজনীয় কম্প্রোমাইজ মনে হয়।
টাইপিং এক্সপেরিয়েন্স অবশ্যই ভালো। কিবোর্ড ম্যাকবুক এয়ারের মতোই লাগে, কিন্তু ব্যাকলাইট না থাকাটা রাতে বা কম আলোতে কাজ করা ইউজারদের জন্য সমস্যা তৈরি করবে।
এবার আসি টাচ আইডি-তে। এটি শুধু ৫১২GB ভ্যারিয়েন্টে পাওয়া যায়। বেস ভ্যারিয়েন্টে নেই। আবারও অ্যাপল আপনাকে বেশি খরচ করতে বাধ্য করছে।
আর সত্যি বলতে, একবার টাচ আইডি ব্যবহার করলে লগইন, পেমেন্ট বা পাসওয়ার্ড দেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
ডিসপ্লে: ভালো, কিন্তু ক্রিয়েটরদের জন্য নয়
ম্যাকবুক নিওতে রয়েছে ১৩ ইঞ্চির IPS ডিসপ্লে, যার ব্রাইটনেস প্রায় ৫০০ নিটস। সাধারণ ব্যবহারের জন্য এটি যথেষ্ট ভালো। ঘরের ভিতরে বা বেশিরভাগ আউটডোর অবস্থায়ও সমস্যা হবে না।
কালার পারফরম্যান্স প্রায় ৯৭% sRGB এবং ৭০% P3। তাই সাধারণ ব্যবহারকারী, কনটেন্ট দেখা বা বেসিক কাজের জন্য এটি ভালো।
কিন্তু আপনি যদি কালার গ্রেডিং, প্রফেশনাল ফটো এডিটিং বা ভিডিও এডিটিং করেন, তাহলে এই ডিসপ্লে আপনার জন্য আদর্শ নয়। এই দামে অনেক OLED ল্যাপটপ আছে যেগুলো আরও ভালো কালার দেয়।
এছাড়া True Tone বা ভালো HDR এক্সপেরিয়েন্স এখানে নেই। তাই সাধারণ ব্যবহারের জন্য ভালো, কিন্তু প্রফেশনাল কাজের জন্য নয়।
পারফরম্যান্স: আসল গল্প (A18 Pro চিপ)
এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে — পারফরম্যান্স।
এখানে অ্যাপল A18 Pro চিপ ব্যবহার করেছে, যা মূলত আইফোনের চিপ, M-সিরিজ নয়। এটাতেই অনেক কিছু বোঝা যায়।
সিঙ্গেল-কোর পারফরম্যান্স খুবই শক্তিশালী। নতুন ম্যাকবুকগুলোর কাছাকাছি। ফলে অ্যাপ খোলা, টাস্ক সুইচ করা, ব্রাউজিং — সবকিছুই স্মুথ লাগে।
কিন্তু মাল্টি-কোর পারফরম্যান্সে সমস্যা আছে।
M1, M2, M3 বা M4 চিপের তুলনায় এটি অনেক দুর্বল, যা হেভি কাজের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
রিয়েল-ওয়ার্ল্ড ইউজ: কী করতে পারবেন, কী পারবেন না
সহজভাবে বললে— সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এটি খুবই ভালো। ব্রাউজিং, এক্সেল, পাওয়ারপয়েন্ট, নোট নেওয়া, রিসার্চ বা হালকা ফটো এডিটিং — সব ভালোভাবে চলে।
স্টুডেন্ট এবং অফিস ইউজারদের জন্য এটি একটি ভালো অপশন।
কিন্তু ভিডিও এডিটিং, রেন্ডারিং বা ৩ডি কাজের মতো হেভি কাজের ক্ষেত্রে এটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
সাধারণ ভিডিও কাটিং বা বেসিক এডিটিং ঠিক আছে, কিন্তু বেশি লেয়ার, ইফেক্ট বা কমপ্লেক্স টাইমলাইন এলে ল্যাগ দেখা যায়।
গেমিং এবং কোডিং পারফরম্যান্স
গেমিংয়ের জন্য এটি তৈরি নয়। হালকা গেম খেলা যাবে, কিন্তু এটি গেমারদের জন্য নয়।
কোডিংয়ের ক্ষেত্রে—বিগিনারদের জন্য ঠিক আছে। কিন্তু হেভি কম্পাইলিং টাস্কে এটি ম্যাকবুক এয়ারের থেকে ধীর।
উদাহরণ হিসেবে, একটি কোড কম্পাইল করতে ম্যাকবুক এয়ারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সময় লেগেছে।
ব্যাটারি লাইফ: অবাক করার মতো ভালো
৩৬Wh ব্যাটারি থাকা সত্ত্বেও অপ্টিমাইজেশন খুবই ভালো।
হেভি ব্যবহারে প্রায় ৮ ঘণ্টা এবং সাধারণ ব্যবহারে ১০–১১ ঘণ্টা ব্যাটারি ব্যাকআপ পাওয়া যায়, যা ম্যাকবুক এয়ারের খুব কাছাকাছি।
চার্জিং একটু ধীর। ২০W চার্জারে প্রায় ২.৫ ঘণ্টা লাগে ফুল চার্জ হতে, আর ৩০W চার্জারে প্রায় ২ ঘণ্টা।
ফাইনাল ভারডিক্ট: কারা কিনবেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আপনার কি এটি কেনা উচিত?
যদি আপনি একজন স্টুডেন্ট, অফিস ইউজার বা দৈনন্দিন কাজের জন্য হালকা ল্যাপটপ চান, তাহলে এটি একটি ভালো অপশন।
কম দামে ম্যাকবুক এক্সপেরিয়েন্স চাইলে এবং হেভি কাজ না করলে এটি আপনার জন্য উপযুক্ত।
কিন্তু যদি আপনার কাজ ভিডিও এডিটিং, হেভি মাল্টিটাস্কিং বা প্রফেশনাল ক্রিয়েটিভ কাজের সঙ্গে জড়িত হয়, তাহলে এটি আপনার জন্য নয়।
সে ক্ষেত্রে ম্যাকবুক এয়ার বা ম্যাক মিনি নেওয়াই ভালো।
Also Read: MacBook Neo Review: Hype or Flop? Can It Replace Your Windows Laptop?
উপসংহার: অ্যাপলের স্মার্ট স্ট্র্যাটেজি
অ্যাপল এখানে খুবই বুদ্ধিমানের মতো খেলেছে। ম্যাকবুক নিও শুধু একটি ল্যাপটপ নয়, এটি অ্যাপল ইকোসিস্টেমে প্রবেশের একটি দরজা।
তারা চায়, আপনি এখান থেকে শুরু করুন এবং পরে এয়ার বা প্রো-তে আপগ্রেড করুন।
তাই কেনার আগে নিজেকে একটাই প্রশ্ন করুন—আপনি আসলে এই ল্যাপটপ দিয়ে কী কাজ করবেন?
কারণ আপনার ব্যবহারের সঙ্গে মিললে এটি একটি ভালো প্রোডাক্ট। না হলে, একটু বেশি খরচ না করার জন্য পরে আফসোস হতে পারে।
আর মনে রাখবেন, ল্যাপটপ একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। তাই বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিন।
0 Comments